সন্তান লালনপালনে সতর্কতা জরুরি
-
অনলাইন ডেস্ক
- আপডেট সময় : ০৩:৫৮:২৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
মা-বাবার কাছে পার্থিব জীবনে সেরা সম্পদ তাদের সন্তান। কৈশোরে সন্তানের চলাফেরা, বন্ধুত্ব, পড়াশোনা ও মানসিক অবস্থার বিষয়ে মা-বাবার সচেতন থাকা জরুরি। কারণ এই বয়সে আবেগের বশে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত কখনো কখনো বড় বিপদের কারণ হতে পারে। অথচ অনেক অভিভাবক সন্তানের প্রয়োজন মেটানো আর তার ভবিষ্যৎ গড়ার ব্যস্ততায় এতোটাই মগ্ন থাকেন যে তারা তাদের সন্তানের প্রতিদিনের জীবন সম্পর্কে খোঁজ রাখার বিষয়টিই উপেক্ষা করেন। সম্প্রতি কুমিল্লায় অল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করছে। দুটি পরিবারেরই শোক অপূরণীয়। এসব ঘটনায় দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি। একইসাথে ঘটনাগুলো আমাদের নিজেদের অভিভাবকত্ব নিয়েও ভাবতে বাধ্য করে।
সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে কিনা, তার আচরণে কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা এসব বিষয়ে খোঁজ রাখা দরকার। কিন্তু আমাদের অভিভাবকরা আদৌ কি এগুলোর খোঁজ রাখি? গত ৭ অক্টোবর মধ্যরাতে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি ধানক্ষেতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় স্কুলছাত্রী তাজমিন। মাত্র পনেরো বছর বয়সী সেই কিশোরী মধ্যরাতে বাইরে একা ছিলেন। তার মা জানিয়েছেন, নিজেদের অবাধ্য হয়ে যাওয়া মেয়েকে নানাভাবে বোঝানোরও চেষ্টা করেছিলেন তিনি। এই কারণে কিশোরী মেয়েটিকে দীর্ঘদিন ধরে স্কুলেও যেতে দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে তুচ্ছ কারণে মায়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে দুদিন আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে দূরের জেলায় চলে যাওয়ার মতো ঘটনা প্রশ্ন তোলে পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন কতটা ছিল এবং তার মানসিক অবস্থার বিষয়ে মা বাবা কতটা সচেতন ছিলেন?
গণমাধ্যমের বরাতে আরও জানা গেছে, দুদিন পরে ফিরলে মেয়েটি বাড়ির দরজায় গিয়ে ডাকার পরও দরজা খোলা হয়নি। পরে সে সিএনজিতে করে তার কোনো এক পরিচিতের বাড়িতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আর এই সময়টাতেই সে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।
এর আগে ১৮ই সেপ্টেম্বর ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমও বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। পরদিন কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।আইনশৃঙ্খলার কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সামান্য একটি ফোন ছিনিয়ে নিতে তাকে হত্যা করা হয়। অথচ অভিযুক্তরা ছিল তারই পরিচিত এবং তাদেরকে সে বন্ধু হিসেবেই নিজ পরিবারের কাছে পরিচয় দিয়েছিল। এখানেও প্রশ্ন থেকে যায় তাহলে ছেলের সেসব বন্ধুদের সম্পর্কে কতটা খোঁজ রাখতেন তার মা-বাবা?
এসব প্রশ্নের উদ্দেশ্য শোকাহত মা-বাবাকে দোষারোপ করা নয়। বরং বোঝা প্রয়োজন, সন্তানের নিরাপত্তায় অভিভাবকের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের খাবার, পোশাক, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাই মা-বাবার একমাত্র দায়িত্ব নয়। সন্তান কী ভাবছে, কোনো সমস্যায় পড়েছে কিনা, কার সঙ্গে মিশছে, তার জীবনে কী ঘটছে, সেসব জানার জন্যও সময় দিতে হয়। একই ছাদের নিচে থেকেও মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।তখন সন্তান বিপদে পড়লেও মা-বাবা তা জানতে পারেন না।
কৈশোরে ছেলেমেয়েরা স্বাধীনভাবে চলতে চায় ঠিকই। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে চায় এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে চায়। কিন্তু এই বয়সে সব সিদ্ধান্তের পরিণতি বোঝার মতো অভিজ্ঞতা তাদের থাকে না। তাই কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কখন ফিরবে, পরিকল্পনার পরিবর্তন হলে জানাচ্ছে কি না, এসব বিষয়ে খোঁজ রাখা অভিভাবকদের দায়িত্ব। একইভাবে সন্তান নিয়মিত স্কুলে না গেলে কিংবা তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
এছাড়া স্মার্টফোন ব্যবহার, অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বন্ধুদের প্রভাব সম্পর্কেও সন্তানকে সচেতন করতে হবে। যথাযথভাবে সন্তানের খোঁজ রাখতে হবে। তবে সন্তানের খোঁজ রাখা মানে সবসময় জবাবদিহি করা, সন্দেহ করা কিংবা প্রতিটি বিষয়ে বাধা দেওয়া নয়। সন্তান যেন নিজের ভুল, ভয় কিংবা বিপদের কথা নির্ভয়ে মা-বাবাকে বলতে পারে সেই পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি। সব বিষয়ে বকাঝকা করলে কিংবা ভুলের জন্য অপমান বা শাস্তি পাওয়ার ভয় তৈরি হলে সন্তান অনেক সময় সত্য গোপন করে। বিপদে পড়েও সাহায্য চাইতে দ্বিধা করে। তাই তার কথা মন দিয়ে শুনতে হবে, সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি বুঝিয়ে দায়িত্বশীল করে তুলতে হবে। সন্তানের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা দরকার, সন্তান অবাধ্য হলেও কোনো অপরাধের দায় তার একার নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’(সুরা আত-তাহরিম, আয়াত ৬)। সন্তানকে সঠিক পথে গড়ে তোলা,তার প্রয়োজন বোঝা এবং বিপদে পাশে থাকাও অভিভাবকত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া, মিথ্যা বলা কিংবা পরিবারের কথা না শোনা কখনোই শিশুর ওপর সহিংসতা চালানোর সমর্থনে কোনো অজুহাত হতে পারে না।নিঃসন্দেহে এটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশুদের নিরাপত্তা এবং আচরণগত পরিবর্তনের বিষয়ে আরও সচেতন হতে হবে।
পরিশেষে, কুমিল্লার পৃথক দুই ঘটনায় প্রাণ হারানো সেই শিশুরা কখনোই আর ফিরে আসবে না। একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষায় এসব হত্যাকান্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তবে এসব পরিণতি থেকে আমাদের অভিভাবকদেরও শিক্ষা নিতে হবে। শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এরাই একদিন বড় হয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব নেবে। তাই ছোটবেলা থেকেই তাদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে এবং সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। সন্তানের প্রয়োজন মেটানো কিংবা ভালো ভবিষ্যতের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি তাকে সময় দিতে হবে। জানতে হবে সে কেমন আছে, কী ভাবছে এবং তার জীবনে কী ঘটছে। সন্তান লালনপালন শুধু তাকে বড় করে তোলাই নয়, দায়িত্বশীল ও সচেতন মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হয়। সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে যাতে কোনো বিপদে পড়লে সন্তান সবার আগে তাঁদের কাছেই ফিরে আসতে পারে। এই বিষয়গুলোকে সঠিকভাবে গুরুত্ব দিলে হয়তো আর কোনো বাবা-মাকে অকালে সন্তানহারা হতে হবে না।
লেখক: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ সাংবাদিক।
জনপ্রিয়


















