Advertisement

গর্ভবতীকে হাসপাতালে রেখে গেল স্বজনরা, পথেই মৃত সন্তান প্রসব

গর্ভবতীকে হাসপাতালে রেখে গেল স্বজনরা, পথেই মৃত সন্তান প্রসব
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চরম মানবিক বিপর্যয় ও নির্মমতার এক চিত্র সামনে এসেছে। এক অসুস্থ গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে এনে ফেলে রেখে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর আপন স্বজনদের বিরুদ্ধে। পরবর্তীতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই মৃত সন্তান প্রসব করেন ওই নারী। হৃদয়বিদারক এই ঘটনাটি ঘটে গত ৪ঠা অক্টোবর বিকেলে। হাসপাতাল ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত ৪ঠা অক্টোবর বিকেল ৫টার দিকে এক ব্যক্তি তাঁর অসুস্থ ও অন্তসত্ত্বা বোনকে রিকশায় করে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি করার পরপরই রোগীকে একা ফেলে তিনি কেটে পড়েন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওই নারীর তীব্র খিঁচুনি শুরু হলে শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক দেখে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. সোনালী দ্রুত রোগীকে মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন এবং অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন। তবে রোগীর সাথে যাওয়ার মতো কোনো স্বজন না থাকায় চরম বিপাকে পড়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ খবর পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে ছুটে আসেন এক স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক। তিনি রোগীর পরিচয় শনাক্ত ও স্বজনদের খোঁজতে অন্তত ২৫-৩০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একপর্যায়ে ওই নারীর দুই ভাইয়ের সন্ধান মেলে। স্বেচ্ছাসেবক তাঁদের জেলা সদর হাসপাতালে যাওয়ার অনুরোধ জানান এবং চিকিৎসার সমস্ত খরচ বহনের আশ্বাস দেন। চিকিৎসকের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ওই স্বেচ্ছাসেবক এবং কমলগঞ্জ হাসপাতালের নার্স স্মৃতি নিজেরাই রোগীর সাথে অ্যাম্বুলেন্সে জেলা সদরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে ওই নারীর প্রসূতি ব্যাথা তীব্র আকার ধারণ করে। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই নার্স স্মৃতির সহায়তায় সন্তান প্রসব হলেও নবজাতকটি মৃত অবস্থায় জন্ম নেয়। পরে জেলা সদর হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হলে নার্স ও মিডওয়াইফরা দ্রুত প্রসূতির চিকিৎসা শুরু করেন। সে সময় জটিলতা দেখা দিলে নার্স স্মৃতি চিকিৎসায় সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঘটনার দিন অ্যাম্বুলেন্স ছাড়ার ঠিক মুহূর্তে ওই নারীর বৃদ্ধ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাবা হাসপাতালে এসে পৌঁছান। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা এবং চলাফেরায় লাচার হওয়ায় সংকটময় এই পরিস্থিতিতে তাঁর পক্ষে কার্যকর কিছু করা সম্ভব ছিল না। পরদিন ৫ অক্টোবর স্বজনেরা ওষুধের জন্য আর্থিক সহায়তা চাইলে ওই স্বেচ্ছাসেবক পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ঘটনাটি শুনে ওই কর্মকর্তা সর্বাত্মক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তিনি ৬ অক্টোবর বিকেলে নিজে উপস্থিত হয়ে চিকিৎসার খরচ বাবদ অর্থ সহায়তা দেন এবং উন্নত চিকিৎসা ও জরুরি রক্তের ব্যবস্থা করার কথা জানান। এ সময় কৌশলে কেটে পড়া রোগীর ছোট ভাইকে ধরে আনার চেষ্টা করা হলে তিনি পালিয়ে যান,তবে বড় ভাইকে এনে ওই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলানো হয়। দারিদ্র্য ও নথিশূন্যতায় দিশেহারা পরিবার: গত ২২শে অক্টোবর সন্ধ্যায় ওই নারীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় চরম দারিদ্র্যের করুণ চিত্র। মাত্র ৭ ফুট বাই ৯ ফুটের একটি ছোট ঘরে বসবাস করে পুরো পরিবার। ঘরটি জরাজীর্ণ বাঁশের চৌকি, এক কোণায় রান্নার চুলা আর ছেঁড়া কাপড়ের আলনা ছাড়া কিছুই নেই। প্রতিবেশীদের দেওয়া চাল ও খাবারে কোনোমতে জীবন বাঁচিয়ে রাখছেন তাঁরা। পারিবারিক সূত্রের বরাতে জানা যায়, ওই নারীর প্রথম পক্ষের ৯-১০ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। চরম দারিদ্র্যের কারণে সে কখনো স্কুলেও যেতে পারেনি। এমনকি নাম লিখতে বা গণনা করতেও জানে না। স্বেচ্ছাসেবক ওই শিশুটিকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। পাশাপাশি জানা গেছে, ওই নারীর দ্বিতীয় স্বামী (যিনি মৃত নবজাতকের বাবা) তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র পুড়িয়ে ফেলেছেন। এমনকি তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়েরও কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। ফলে দারিদ্র্যের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনি কাগজের অভাবে চরম আইনি ও সামাজিক জটিলতায় দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি। ঘটনা প্রসঙ্গে ওই তরুণ স্বেচ্ছাসেবক জানান, “আমি আমার সাধ্যমতো পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু এককভাবে এত বড় অভাবের সমাধান সম্ভব নয়। শিশুটির শিক্ষার দায়িত্ব আমি নেব। তবে সমাজের বিত্তবান ও সহানুভূতিশীল মানুষজন এগিয়ে এলে এই নিঃস্ব পরিবারটির দুর্দশা কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।” মানবিক এই পুরো প্রক্রিয়ায় চিকিৎসক ডা. সোনালী, নার্স স্মৃতি, অ্যাম্বুলেন্সচালক, স্থানীয় আনোয়ার এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেই কর্মকর্তার মহানুভবতা ও জরুরি পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসিত কুড়িয়েছে।
Advertisement
চাঁদা দাবি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ অস্বীকার আবুল কাশেমের

চাঁদা দাবি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ অস্বীকার আবুল কাশেমের