Advertisement

এআই আসতেই ধরা পড়ছে ইন্টারনেটের দুর্বলতা

এআই আসতেই ধরা পড়ছে ইন্টারনেটের দুর্বলতা
ইন্টারনেটের নিরাপত্তাব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে এর পেছনে শুধু নতুন সাইবার হামলা নয়, বরং বহু বছর ধরে ব্যবহৃত সফটওয়্যারের পুরোনো ত্রুটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এসব ত্রুটি আগের চেয়ে দ্রুত শনাক্ত করতে পারায় সামনে আসছে ডিজিটাল অবকাঠামোর দীর্ঘদিনের দুর্বলতা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে টেকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ডিজিটাল সার্টিফিকেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইমুদ্রার নিরাপত্তা ত্রুটি এবং পিএইচপি সফটওয়্যারের কয়েকটি দুর্বলতা প্রযুক্তি বিশ্বকে নতুন করে সতর্ক করেছে। এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, এত দিন নির্ভরযোগ্য বলে বিবেচিত প্রযুক্তির মধ্যেও গুরুতর ত্রুটি থাকতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর ‘ওয়েন’ ছদ্মনামের এক স্বাধীন গবেষক ভারতের ইমুদ্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুতর ক্রিপ্টোগ্রাফিক দুর্বলতা শনাক্ত করেন।

সমস্যাটি কোনো সরাসরি হ্যাকিং বা তথ্য ফাঁসের কারণে সামনে আসেনি। বরং সফটওয়্যারের একটি স্ক্রিপ্টের ভুলের কারণে দুর্বল ক্রিপ্টোগ্রাফিক কী তৈরি হয়েছিল, যা দীর্ঘ সময় শনাক্ত হয়নি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ইমুদ্রা আটটি ইন্টারমিডিয়েট সার্টিফিকেট অথরিটির জন্য ক্রিপ্টোগ্রাফিক কী তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। এসব কী ডিজিটাল সার্টিফিকেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু কী স্থানান্তরের একটি প্রক্রিয়ায় স্ক্রিপ্টের ত্রুটির কারণে দুর্বল কী তৈরি হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর একটি কী ছিল মাত্র ‘৪’ সংখ্যা। ইমুদ্রার সহপ্রতিষ্ঠাতা কৌশিক শ্রীনিবাসন জানান, নিরাপদ হার্ডওয়্যারে কী তৈরি করা হলেও সেগুলোর এনক্রিপ্ট করা ও পুনরায় ডিক্রিপ্ট করার প্রক্রিয়ায় ভুল হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল প্রক্রিয়াগত ত্রুটি; অবকাঠামোয় সরাসরি হামলা বা তথ্য ফাঁসের ঘটনা নয়।প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেটগুলো উৎপাদন পর্যায়ে ব্যবহার করা হয়নি। ফলে সেগুলোর মাধ্যমে ভুয়া পরিচয়পত্রধর্মী ওয়েব সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়নি বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে। তবু দুর্বলতাটি শনাক্ত হওয়ার পর গুগল, মজিলা, অ্যাপল ও মাইক্রোসফট সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেটগুলো ব্লক করে। ২২ অক্টোবর ইমুদ্রা বৈশ্বিক এসএসএল/টিএলএস সার্টিফিকেট ব্যবসা থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয়। 

একই সময়ে পিএইচপি সফটওয়্যারের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা দুর্বলতাও শনাক্ত হয়। ওয়েবসাইট ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে বহুল ব্যবহৃত এই প্রযুক্তির ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাও সতর্কতা জারি করে।

এআইয়ের সাহায্যে এসব ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করার সক্ষমতা প্রযুক্তি খাতের পুরোনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। আগে জটিল কোডের গভীরে থাকা ত্রুটি খুঁজতে গবেষকদের দীর্ঘ সময় ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের প্রয়োজন হতো। এখন উন্নত এআই মডেল বিপুল পরিমাণ কোড বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য দুর্বলতা দ্রুত চিহ্নিত করতে পারে।

সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সাইবলের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মান্দার পাটিলের মতে, এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ, নথি বিশ্লেষণ, ত্রুটি শনাক্ত এবং সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা তৈরির কাজ আরও কার্যকর করতে পারে। তবে এ সক্ষমতা যেমন নিরাপত্তা গবেষকদের কাজে লাগতে পারে, তেমনি সাইবার অপরাধীরাও অপব্যবহার করতে পারে।

ইমুদ্রার ত্রুটি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নন্দিনী ট্যান্ডন বলেন, এআই দুর্বলতা তৈরি করেনি; বরং এ ধরনের ত্রুটি দ্রুত ও কম খরচে খুঁজে পাওয়ার সুযোগ বাড়িয়েছে। ফলে কোনো ত্রুটি তৈরি হওয়া এবং সেটি কাজে লাগিয়ে হামলা চালানোর মধ্যবর্তী সময় কমে আসতে পারে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রাউজারে নিরাপত্তা হালনাগাদ এলেই সব ব্যবস্থা নিরাপদ হয়ে যায় না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সার্ভার, পেমেন্ট ব্যবস্থা, এপিআই ও মোবাইল অ্যাপের নিজস্ব ট্রাস্ট স্টোর থাকতে পারে। সেগুলো আলাদাভাবে হালনাগাদ না করলে পুরোনো সার্টিফিকেটের ওপর নির্ভরতা থেকে যেতে পারে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই দিয়ে নিরাপত্তার দুর্বলতা শনাক্ত করার পাশাপাশি নিয়মিত সফটওয়্যার পরীক্ষা, স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং দ্রুত ত্রুটি সংশোধনের ব্যবস্থা জরুরি। তবে এআইয়ের ফলাফলও মানুষের যাচাই করা প্রয়োজন, কারণ এআই কখনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর ফল দিতে পারে।

প্রযুক্তি ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এআইয়ের মাধ্যমে দুর্বলতা শনাক্ত করা সহজ হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্বও নতুন করে আলোচনায় আসছে। যে ত্রুটি আগে দীর্ঘ সময় অজানা থেকে যেত, তা এখন দ্রুত খুঁজে পাওয়া সম্ভব হলে প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ নিরাপত্তা পরীক্ষা করেছে কি না, সেই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এআই ইন্টারনেটের সব দুর্বলতা তৈরি করছে না; বরং আগে থেকে থাকা ত্রুটিগুলো সামনে আনার গতি বাড়াচ্ছে। এই প্রযুক্তি সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে বড় সুযোগ তৈরি করলেও যথাসময়ে ত্রুটি সংশোধন না হলে একই সক্ষমতা হামলাকারীদেরও সুবিধা দিতে পারে। –কালেরকণ্ঠ