সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় দুর্নীতি দমন কমিশনের এক অভিযানে পাওয়া জিও লোকেশন, এসএমএস, সিডিআরের প্রিন্টেড ভার্সন থেকে এ মামলা নতুন মোড় নিয়েছে।
প্রসিকিউশনের বরাতে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন মতে, প্রাথমিকভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা পেয়ে তদন্তপূর্বক যাচাই বাছাই করছে প্রসিকিউশন। এছাড়া প্রতিবেদনে ডিএনএ, সাক্ষী, জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে সাংবাদিক দম্পতি মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি তাদের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়।
ওই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি রুনির ভাই নওশের আলী রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। প্রথমে মামলার তদন্ত করেন শেরেবাংলা নগর থানার এক কর্মকর্তা। একই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্তভার পড়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল আলমের ওপর। দুই মাস পর হাইকোর্টের আদেশে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র্যাব)। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি সংস্থাটি।
এ অবস্থায় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এক আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। পরে টাস্কফোর্স গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পরবর্তীতে প্রতিবেদন দিতে কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়।
টাস্কফোর্সের সচিব ও তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআিইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজিজুল হক অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনের ‘বিশেষ পর্যবেক্ষণ’ অংশে বলা হয়, ডিএনএ পরীক্ষার প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী সাগরকে বাঁধার জন্য ব্যবহৃত চাদর এবং রুনির টি-শার্ট হতে পাওয়া নমুনা পরীক্ষায় দুটি অপরিচিত পুরুষ ডিএনএ প্রোপাইল পাওয়া যায়। এ অপরিচিত অপরাধী শনাক্ত করতে ডিএনএ প্রস্তুতকারী যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ল্যাব সম্ভাব্য প্রচেষ্টা চালিয়েও অপরাধীদের শনাক্তে ছবি প্রস্তুত করতে পারে নাই। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ডিএনএ অধিক মিশ্রণ, ফলে কোনও মিল খুঁজে পাওয়া যায় নি। এছাড়া তদন্তে প্রাপ্ত সন্দেহভাজন সব ব্যক্তি/আসামি ডিএনএর সঙ্গে উক্ত অজ্ঞাত ডিএনএ মিলে কিনা তা পরীক্ষা করা হয়।
তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতির বিষয়ে বলা হয়, মামলাটি তদন্তকালে আগের তদন্তকারী কর্মকর্তারা মোট ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করেন। টাস্কফোর্স তদন্তকালে ৯০ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা হয়। এছাড়া ভিসেরা রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এছাড়া মামলার আলামত ও ২৫ জন ব্যক্তির সোয়াব সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ও নেদারল্যান্ডের একটি ল্যাবে পাঠানো হয়। আলামতে প্রাপ্ত ডিএনএর সঙ্গে পাঠানো ব্যক্তিদের ডিএনএ ম্যাচিং হয়নি। ওই প্রতিবেদনে পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনাস্থলে মোট চারজন ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩ জন পুরুষ ও একজন মহিলা। তিনজন পুরুষের মধ্যে একজন ভিকটিম সাগর ও একজন মহিলা হলো রুনি বলে শনাক্ত হয়। বাকি দুইজন অজ্ঞাত পুরুষ ব্যক্তি কারা তা উদ্ঘাটন করা যায়নি। এই দুইজনের ডিএনএ থেকে ছবি করতে যুক্তরাষ্ট্রের ছবি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। কিন্তু ডিএনএতে অধিক মিশ্রণ জনিত কারণে ছবি প্রস্তুত করতে পারেনি তারা। দীর্ঘ তদন্তেও ওই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ এবং হত্যাকাণ্ডকে কে বা করা জড়িত তা আজ অবধি নির্দিষ্ট করা যায়নি।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বলা হয়, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে একজনকে হত্যার পর অপরজন আত্মহত্যা করার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা যায় দুইজনকে হত্যা করা হয়েছে। পেশাগত কারণে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে এ ধরনের কোন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নি। দীর্ঘদিন এই দম্পতি দেশের বাইরে জার্মানিতে ছিল। মৃত্যুর ৭ মাস পূর্বে দেশে আসেন। সাগরের কর্মস্থল মাছরাঙ্গা টিভির সহকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে পেশাগত দিক থেকে তার কোনও ধরনের শত্রুতা বা বিরোধের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্ট ২০১৫ সালে কার্যক্রম শুরু করে, যার নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে। তাদের মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে নির্মাণকাজ ও কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সামিট গ্রুপের সাথে তাদের হত্যার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। অর্থ ও জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে কিনা তদন্তকালে এই ধরনের কোন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নি। তাদের কোনও ব্যবসায়িক লেনদেন বা ধারকর্জের কোন তথ্য পাওয়া যায় নি। গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায়, কারো সঙ্গে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ছিলনা। দাম্পত্য কলহের কারণে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এই ধরনের কোনও তথ্যা পাওয়া যায় নি।
ভবনের সিকিউরিটি গার্ড নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মামলার ঘটনাস্থলের ভবনের সিকিউরিটি গার্ড এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবিরকে র্যাব সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে ২০১৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করে। সে এখনও কারাগারে আছে। আদালতের নির্দেশে সিকিউরিটি গার্ডকে কাশিমপুর কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন তাকে অস্বাভাবিক আচরণ করতে দেখা যায় এবং ঠিকমত উত্তর দিতে না পারায় পুনরায় আদালতের অনুমতি নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। একইসঙ্গে একজন আইনজীবী তার চিকিৎসা সংক্রান্তে আবেদন করলে আদালত তার চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে আসামিকে পরীক্ষা করে আগামী ৫ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেন।
প্রতিবেদনের মন্তব্য অংশে বলা হয়, এ মামলায় লুষ্ঠিত মোবাইল ফোন সেট ও দুইটি ল্যাপটপ অদ্যবধি উদ্ধার করা যায়নি। এ মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাগর-রুনী হত্যা মামলার মিডিয়া মুখপাত্র সাবেক ডিএমপি-ডিবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, সাবেক র্যাব মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাওয়া যায়নি নি। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। সাংবাদিক রুমী নোমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। অন্যান্যদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে। উল্লিখিত ব্যক্তিদের তদন্তের স্বার্থে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হয়তো বা মামলার কোন গুরুত্বপূর্ণ কোনও তথ্য বা দিক নির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।
নতুন তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩০ আগস্ট বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এর প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা এক বক্তব্যে বলেন, এনটিএমসি’র সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় দুদক অভিযান চালায়। সেখানে বেশ কিছু ডিজিটাল আলামত পেয়ে দুদক সেগুলো জব্দ করে। যেখানে বিভিন্ন রকম জিও লোকেশন, এসএমএস, সিডিআরের প্রিন্টেড ভার্সন পান এবং এই সংক্রান্তে জিয়াউল আহসানের সহকারিকে (একজন সেনা সদস্য) জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ওই প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্তে জিয়াউল আহসান এবং একজন মিডিয়া ব্যক্তিবর্গের সংশ্লিষ্টতা পান বলে বর্ণনা দেন। এ বক্তব্য সমর্থন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও একই ধরনের বক্তব্য দেন।
পরে টাস্কফোর্সের সঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর ও প্রসিকিউটরের সঙ্গে আলোচনাকালে তারা প্রাথমিকভাবে সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা পেয়ে তদন্তপূর্বক যাচাই বাছাই করছেন বলে জানান। তাদের প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে প্রাপ্ত তথ্যাদি পিবিআই এর তদন্তকারী কর্মকর্তাকে হস্তান্তর করবেন বলে জানান। এ অবস্থায় গত ১৩ অক্টোবর তাদের কাছে সংরক্ষিত মামলার ডিজিটাল আলামত ও তথ্য উপাত্ত তদন্তের নিমিত্তে হস্তান্তর করার জন্য আবেদন করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনও তথ্যাদি পাওয়া যায় নি।
মামলাটির মূল রহস্য উদঘাটন, অপরাধীদের শনাক্তকরণসহ গ্রেপ্তার, লুণ্ঠিত বর্ণিত মালামাল উদ্ধার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) কর্তৃক প্রাপ্ত তথ্যাদি তদন্তপূর্বক যাচাই বাছাইসহ সাক্ষীদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের লক্ষ্যে মামলাটির তদন্তকার্য সম্পন্ন করতে আর সময় প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস বলেন, জিয়াউল আহসানের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত সিডি প্রায় ৩০০ এবং সেখানে অসংখ্য ডাটা, কথোপকথন, ভিডিও, অডিও এবং নানা রূপ অপরাধের তথ্য থাকতে পারে। তারা সেগুলো পর্যালোচনা করবেন এবং পর্যালোচনার শেষে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য প্রমাণ ও উপাত্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা দিলেই তিনি সে অনুযায়ী তদন্তের পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন। সূত্র-চ্যানেল 24


















