Advertisement

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে নতুন প্রস্তাব

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে নতুন প্রস্তাব

সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে নতুন প্রস্তাব উঠেছে। এতে ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষের অর্ধেক আসন এবং সংসদের আসনের অনুপাতে বাকি অর্ধেক আসনের সদস্যদের নির্বাচিত করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার ও বিরোধীদল উভয়ের অবস্থান অটুট থাকার পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার সমস্যার সমাধান হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত সদস্যদের সূত্রে জানা গেছে, ওই শিক্ষকের প্রস্তাব ছিল, উচ্চকক্ষ গঠন হতে পারে ১০৫ সদস্যের। এর মধ্যে সংসদীয় আসন অনুযায়ী ৫০টি এবং ভোটের অনুপাতে ৫০টি আসনের সদস্যদের নির্বাচন করা হবে। আর ৫টি আসনের সদস্য রাষ্ট্রপতি মনোনয়ন দেবেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

বৈঠকে অংশ নেয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষাবিদ এই প্রস্তাবকে গ্রহণযোগ্য উল্লেখ করে উচ্চকক্ষের স্পিকারের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। তার ভাষ্য, এই প্রস্তাব গৃহীত হলে সংবিধানে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদ সৃষ্টি করা যায়, উচ্চকক্ষের স্পিকার পদাধিকার বলে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকবেন। সরকার ও বিরোধীদলের মনোনয়নে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্য উপদেষ্টারা উচ্চ কক্ষ থেকেই মনোনীত হবেন।

একইসঙ্গে তিনি সংসদের নিম্নকক্ষের মেয়াদ ৪ বছর ও উচ্চকক্ষের মেয়াদ ৬ বছর করার প্রস্তাব দেন। এতে সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও কোনো একটি নির্বাচিত সংসদ সবসময় বহাল থাকবে।

শনিবারের এ বৈঠকে ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’র সদস্য এবং কমিটির আমন্ত্রিত সংবিধান বিশেষজ্ঞ, সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপকরা অংশ নেন। সংবিধান সংশোধন কমিটির পক্ষ থেকে বৈঠকে ৬০ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ৪৪ জন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

সরকারি দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সংসদের আসন অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল। অন্যদিকে, প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা চায়।

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির কাঠামো, প্রক্রিয়া ও কর্মপরিধি নিয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলাপ হয়েছে। কেউ কেউ এমন প্রস্তাব করেছেন যে, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংসদে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে সরকার ও বিরোধীদলের মতামতের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষের স্পিকারের নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যেতে পারে।

‘এমন প্রস্তাব বিবেচনা করা যায়’ উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘স্পিকার বাদে অন্যান্য যারা উপদেষ্টা থাকবেন তারা সরকারি ও বিরোধীদলের সম্মতিতে যদি অ্যাডভাইজার হিসেবে নিযুক্ত হন, সেটার একটা বিধান থাকতে পারে বলে অনেকে মতামত দিয়েছেন। এটা বিবেচনা করা যায়।

তবে এ সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়ার সুযোগ নেই জানিয়ে কমিটির প্রধান বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন নিয়ে এ বৈঠকের আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আলোচনা যেহেতু শেষ হয়নি, আরও প্রস্তাব পাওয়ার পর বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কমিটিতে উপস্থাপন করব। সবাই বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, মতামত দিয়েছেন। আমাদের আলোচনার মধ্যে এ পর্যন্ত আমরা যে কয়টি বৈঠক করেছি তার মধ্যে আজকের আলোচনাটা ছিল সবচাইতে ফলদায়ক।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের আর দুই-একটা বৈঠক বাকি আছে। ইতোমধ্যে আমরা কমপাইলেশন শুরু করেছি। যেহেতু আমাদের সময় নির্ধারিত আছে (প্রতিবেদন) দেওয়ার জন্য।’

বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং প্রশাসনিক, আইন তৈরির ও সংবিধান সংশোধনের বিচারিক পর্যালোচনা নিয়ে আলোচনা হয়। এসব ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা বা সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে আলোচকরা মতামত দিয়েছেন। বিচার বিভাগের এখতিয়ার নিয়ে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে তারা বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানান কমিটি প্রধান।

তিনি বলেন, বিচারবিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি কীভাবে কার্যকর করা যায়, সে বিষয়েও আলোচকরা প্রস্তাব দিয়েছেন। একইসঙ্গে বিচারক নিয়োগে আইন প্রণয়ন, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

এর বাইরে ৭০ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রে ৪টি বিষয়, অর্থাৎ সংবিধান সংশোধন, অর্থবিল, আস্থা ভোট ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় বাদে বাকি সব বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে তাদের ভোট দিতে পারবেন। এই বিষয়টাতে মোটামুটি সবাই একমত পোষণ করেছেন বলে জানিয়েছেন কমিটির প্রধান।

এছাড়া, শনিবারের বৈঠকে একসঙ্গে দল, সরকার ও সংসদ- এই তিন প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে এক ব্যক্তি থাকা বা না থাকার বিষয়টি স্থান পায় আলোচনায়। এক্ষেত্রে কেউ কেউ ৩টির পরিবর্তে ২টি পদে এক ব্যক্তি থাকার পক্ষে মত দেন বলে বৈঠক সূত্র জানায়। তবে জুলাই সনদে এক ব্যক্তি একটির বেশি দায়িত্বে না থাকার প্রস্তাব আছে, যেখানে বিএনপি আপত্তি দিয়েছিল।

সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদীয় কমিটি কোনো বিষয়ে যে কাউকে তলব করতে পারে, কিন্তু উপস্থিত হওয়ার বিষয়ে বাধ্য করতে পারে না। এ বিষয়ে আইন করার সুযোগ থাকলেও কোনো সরকার সেটা করেনি। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে কমিটির প্রধান সালাহউদ্দিন আহমদ আইন প্রণয়নের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।

সংসদীয় কমিটিগুলোতে আনুপাতিকহারে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি জুলাই সনদে আছে, সংবিধান সংশোধনের পর সেটা কার্যকর হবে।’

উল্লেখ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ১৩ জুলাই সংসদে ১৭ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। কমিটির জন্য সরকার ও জোটসঙ্গীদের মধ্য থেকে ১২ সদস্যের নাম ঘোষণা দিয়ে বিরোধীদল থেকে ৫ সদস্যের নাম চাওয়া হলেও বিরোধীদল এই কমিটিতে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে। সূত্র- সমকাল