Advertisement

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ, বিশেষ উদ্যোগ সরকারের

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রশিক্ষণ, বিশেষ উদ্যোগ সরকারের

অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং, পরিচয় জালিয়াতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির মতো সাইবার অপরাধে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি বাড়ছে মানসিক বিপর্যয়, পারিবারিক কলহ ও সামাজিক মর্যাদাহানির ঘটনা। ভুয়া লিংক, প্রতারণামূলক ফোনকল এবং অনলাইনে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে অপরাধীরা। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও সম্প্রতি ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ১ অক্টোবর ঢাকায় গঠন করা হয়েছে স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট।

অনলাইন প্রতারণায় আর্থিক ক্ষতি

ঘরে বসে খণ্ডকালীন কাজ করে আয় কিংবা ইউটিউবের ভিডিওতে ‘লাইক’ দিয়ে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে গৃহিণী, শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করছে প্রতারকেরা।

শুরুতে এক হাজার বা দুই হাজার টাকা বোনাস দিয়ে আস্থা অর্জন করা হয়। পরে বিভিন্ন ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করার নামে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়। একপর্যায়ে টাকা হাতিয়ে নিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট। একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরেই এ ধরনের প্রতারণায় সাধারণ গ্রাহকেরা শত শত কোটি টাকা হারিয়েছেন।

এ ছাড়া অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণা, ভুয়া লিংক ব্যবহার করে অর্থ আত্মসাৎ এবং ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঘটনাও বাড়ছে। পাসওয়ার্ড, ছবি ও ভিডিও হাতিয়ে নিয়ে সেগুলো প্রতারণা কিংবা হয়রানির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সিআইডিতে ১৯১ মামলা

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত ১৯১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) মামলা ৩২টি এবং সিআর (ক্রিমিনাল রেজিস্টার) মামলা ১৫৯টি। এ সময়ে সাইবার অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০১ জনকে।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানির মামলাগুলো পেশাদারত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এসব অপরাধ দমনে নিয়মিত নজরদারি ও টহল কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি জানান, সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এফটিআই) এবং ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস) চলমান প্রশিক্ষণে নতুন মডিউল যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ সদরদপ্তরের উদ্যোগে দেশব্যাপী ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স চালু হয়েছে, যাতে সিআইডির কর্মকর্তারাও অংশ নিচ্ছেন।

রাজধানীতে সাইবার অপরাধের চিত্র

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত রাজধানীর আটটি বিভাগে সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে, রমনায় ৮৮টি মামলায় ১৬৩ জন, লালবাগে ২২টি মামলায় ২৩ জন, ওয়ারীতে ১২টি মামলায় ২৪ জন, মতিঝিলে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জন এবং তেজগাঁওয়ে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া মিরপুরে ৩৩টি মামলায় ২৭ জন, গুলশানে ৩৮টি মামলায় ৩৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৬টি মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে। অপরাধ দমন ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে বাহিনীটি।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, ডিএমপির ডিবিতে একটি সাইবার ল্যাব রয়েছে। এ ছাড়া কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমে (সিটিটিসি) ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল অপরাধের মামলা তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে।

৪ হাজার ৫৯২ সদস্যের সাইবার পুলিশ ইউনিট

পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ অক্টোবর ঢাকায় গঠিত স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিটে পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মী মিলিয়ে রয়েছেন ৪ হাজার ৫৯২ জন। একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে ইউনিটটি পরিচালিত হচ্ছে। বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়েও সাইবার অপরাধ তদন্তে পৃথক কার্যক্রম বা ডেস্ক রয়েছে।

সম্প্রতি মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তে ১০ দিনব্যাপী বিশেষ টিওটি কোর্স পরিচালনা করা হয়। পর্যায়ক্রমে এতে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।

মানসিক ও সামাজিক ক্ষতিও বাড়ছে

সাইবার অপরাধের কারণে শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ভুয়া আইডি খুলে মিথ্যা তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। অনলাইন হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়ে অনেকে ভয়, হতাশা ও মানসিক চাপে ভুগছেন। সাইবার বুলিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবনও ব্যাহত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সাইবার অপরাধও বাড়ছে। ওটিপি শেয়ারিং, ভুয়া ফোনকল, ডিপফেক ভিডিও, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে অনেকে সারা জীবনের সঞ্চয় হারাচ্ছেন। এর ফলে কেউ কেউ মানসিক সমস্যায় পড়ছেন, এমনকি চরম পরিণতির দিকেও ধাবিত হচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল পাসওয়ার্ড, অপরিচিত লিংকে ক্লিক, ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়। তারা অপরিচিত কাউকে পিন বা ওটিপি না দেওয়া, সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলা এবং অনলাইনে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য প্রকাশে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। সূত্র-বাসস

Advertisement
আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা সফলভাবে শেষ করে দেশে ফিরেছেন রোটারিয়ান নাজমুল হাসান

আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা সফলভাবে শেষ করে দেশে ফিরেছেন রোটারিয়ান নাজমুল হাসান