রাঙ্গুনিয়ার চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী নদীতে নির্মিত হচ্ছে দেশের প্রথম ক্যাবল-স্টেইড সেতু
-
অনলাইন ডেস্ক
- আপডেট সময় : ০৩:১৮:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
- রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম
খরস্রোতা কর্ণফুলী নদীর বুকে নির্মিত হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম চার লেনের ক্যাবল-স্টেইড সেতু। উঁচু পাইলন থেকে টানা ইস্পাতের তারের সাহায্যে সেতুর মূল কাঠামো ধরে রাখার এ আধুনিক সেতু নির্মিত হবে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার সংযোগস্থলে চন্দ্রঘোনা-রাইখালী ফেরিঘাট এলাকায়। প্রায় ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৩২ মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মিত হলে রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের ফেরি-ভোগান্তি কমবে। খুলবে যোগাযোগ, পর্যটন ও বাণিজ্যের নতুন দুয়ার।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটির সঙ্গে রাজস্থলী ও বান্দরবান জেলার যোগাযোগ সহজ করতে ১৯৮৯ সালে চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী নদীর ওপর ফেরি সার্ভিস চালু করা হয়। প্রায় ৩৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো একটি ফেরির ওপর নির্ভর করেই দুই পাড়ের যানবাহন পারাপার করতে হচ্ছে। পন্টুনের সমস্যা, ডুবোচর ও নদীর তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। এতে যাত্রী, চালক ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
চার লেনের আধুনিক সেতু
সওজ রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানান, স্টিল ও কংক্রিটের সমন্বয়ে নির্মিতব্য সেতুটির মূল অংশের দৈর্ঘ্য হবে ৫৩২ মিটার। এর সঙ্গে থাকবে ৪৫৫ মিটার ভায়াডাক্ট এবং ১ হাজার ২৫০ মিটারের বেশি দীর্ঘ এলিভেটেড সড়ক। চার লেনের সেতুটিতে যুক্ত করা হবে আধুনিক ‘ব্রিজ স্মার্ট হেলথ মনিটরিং সিস্টেম’, যার মাধ্যমে সেতুর অবস্থা ও স্থায়িত্ব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। থাকবে স্বয়ংক্রিয় টোল প্লাজাও।
ক্যাবল-স্টেইড সেতুতে উঁচু টাওয়ার বা পাইলনের সঙ্গে যুক্ত তির্যক ইস্পাতের তার সেতুর চলাচলের পথের ভার বহন করে। ফলে দীর্ঘ স্প্যান তৈরি করা সম্ভব হয় এবং নদীর মাঝখানে পিলারের প্রয়োজন কমে আসে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও নৌযান চলাচলে বাধা কমানোর সুযোগ থাকে।
অনুমোদনের অপেক্ষায় প্রকল্প
সওজ সূত্র জানায়, রাঙামাটি-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়কের (আর-১৬১) ২১তম কিলোমিটারে সেতুটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য ৭ দশমিক ৫২ হেক্টর জমি অধিগ্রহণে ২৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সেতুর চূড়ান্ত নকশা তৈরি করে প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভাও হয়েছে। এখন ডিপিপি পুনর্গঠন করে আবার পাঠাতে হবে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। ২০৩১ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফেরির অপেক্ষায় আটকে থাকে জীবন
বর্তমানে চন্দ্রঘোনা ফেরিতে একবারে মাত্র ৮ থেকে ১০টি ট্রাক বা বাস এবং ১৫ থেকে ২০টি ছোট ও হালকা যানবাহন পারাপার করা যায়। নদী পার হতে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লাগে। নদীতে স্রোত বেড়ে গেলে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধের গেট খুলে দিলে কিংবা পানি কমে গেলে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখতে হয়।
চন্দ্রঘোনার ব্যবসায়ী ফরিদ আহমদ বলেন, প্রতিদিন এ ফেরিঘাট দিয়ে প্রায় ৯০০ থেকে এক হাজার ছোট-বড় যানবাহন পারাপার হয়। কিন্তু ফেরির কারণে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকে ছোট সাম্পানে নদী পার হন।
তিনি বলেন, রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবান জেলার কয়েক লাখ মানুষ এ ফেরির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটকদের কাছেও তিন পার্বত্য জেলা ঘুরে কক্সবাজার যাওয়ার এ পথটি জনপ্রিয়।
কাপ্তাইয়ের রাইখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা থোয়াই অং মারমা বলেন, ‘ফেরি অচল থাকলে আমরাও থেমে থাকি। দুই-তিন মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ৪৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময় লাগে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন জরুরি রোগীরা। রাত-বিরাতে অ্যাম্বুলেন্সকেও ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অথচ সেতু থাকলে কয়েক মিনিটেই নদী পার হওয়া যেত।’
বদলে যাবে বাণিজ্য ও পর্যটন
রাইখালী বাজারের ব্যবসায়ী তনয় তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ফেরির ঝামেলায় পাহাড়ি এলাকার কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে পৌঁছানো যায় না। অনেক সময় ফেরি বিকল হয়ে মাঝনদীতে আটকে পড়ে। সেতু নির্মিত হলে বান্দরবান ও রাঙামাটির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের চিত্র বদলে যাবে।
ট্রাকচালক রহিম উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন ইট পরিবহনের কাজে তাঁকে এ ফেরি পার হতে হয়। কখনো এক ঘণ্টায় নদী পার হওয়া যায়, আবার কখনো দীর্ঘ যানজটে বসে থাকতে হয়। সেতুটি হলে সময়ের অপচয় ও জীবনের ঝুঁকি— দুটিই কমবে।
সওজের উপসহকারী প্রকৌশলী কীর্তি নিশান চাকমা বলেন, সেতুটি শুধু যাতায়াত সহজ করবে না, রাঙামাটি ও বান্দরবানের পর্যটনশিল্পের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দুই পার্বত্য জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্পের বিকাশে এ সেতু মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
কাপ্তাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, চন্দ্রঘোনায় সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে এবং দুই জেলার আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।
রাজস্থলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাস্টার খলিলুর রহমান শেখ বলেন, সেতুটি নির্মিত হলে বান্দরবান, রাজস্থলী, চন্দ্রঘোনা, রাইখালী, রাঙ্গুনিয়া ও কাপ্তাই এলাকার মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে। পাশাপাশি এসব এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
দীর্ঘদিনের ফেরিনির্ভরতা কাটিয়ে কর্ণফুলীর ওপর এ সেতু নির্মিত হলে পাহাড় ও সমতলের যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলে আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এখন প্রয়োজন প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন ও নির্মাণকাজ শুরু।
জনপ্রিয়


















